‘দেখো ক্যায়সে ভর ভরকে মাখন দে রহা হ্যায়, ও ভাই।’ ‘লেগ পিসের সাইজ দেখে নিন। পুরো ২০০ গ্রাম।’ ‘পকেটে ১০০ টাকা আছে। কী খাওয়াবে?’ এর উত্তরে ভেসে আসে ‘১০০ তো অনেক। ৬০ টাকায় ভরপেট খাইয়ে দেব। ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারি, মাছ ও মাংস, চাটনি।’
শর্ট ভিডিও এবং রিলের সুবাদে এমন অভিজ্ঞতা প্রায় প্রত্যেকেরই রয়েছে এখন। কোথায় কোন খাবার কত সস্তা অথচ কত সরেস, তা জানাতে না-পারলে যেন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ঘুম নেই। বিরিয়ানির উপর খাঁটি গাওয়া ঘি ঢালার অনুপম দৃশ্য দেখে পাবলিক চমৎকৃত। কুলচার সঙ্গে পনিরের পরিবেশন দেখিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর দাবি করছে: এ খাবার ভূ-ভারতের সেরা। আহ্লাদ করে, নানা ধরনের কণ্ঠসুরে, কনটেন্ট ক্রিয়েটরগণ রীতিমতো জমিয়ে দিয়েছে।
১৫ বছর আগেও এমনটি ভাবা যেত না। কোথাকার খাবার ভালো, কোথাকার রেসিপি অনন্য তা ছড়িয়ে পড়ত লোকমুখে, এবং তাতে অনেক সময় লাগত। এখন প্রযুক্তি এসে পায়ের তলায় ঘাস গজাতে দিচ্ছে না। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কম্বিনেশনে হু হু করে ছড়িয়ে যাচ্ছে খাদ্যাখাদ্যের বিজ্ঞাপন। সেই সঙ্গে ছড়াচ্ছে বিক্রেতাদের স্টাইল স্টেটমেন্ট, কথা বলার কায়দা, পারস্পরিক রেষারেষি। সব মিলিয়ে অভিনব বিজ্ঞাপন। ফুড ব্লগারদের সৌজন্যে ছোট ও মাঝারি খাদ্যবিক্রেতা ও নাম-না-জানা খাবারের দোকান এখন ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। মানুষও মজেছে।
কনটেন্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেকেই খেতে চলে যাচ্ছে সেসব দোকানে, স্টলে। কিন্তু খাবারের গুণমান বাস্তবে উতরোল কি না, সে নিয়ে আলোচনা হয় কি? গুচ্ছ তেলমশলা দিলেই বুঝি রান্না খোলতাই হয়? ১০০-র জায়গায় ৬০ টাকায় পুরো থালি পাওয়া গেলেই কি সে খাবার খেতে উত্তম ও সুস্বাদু? কোয়ান্টিটি অনেকটা মানেই কি সে খাবারের প্রশ্নচিহ্নের ঊর্ধ্বে?
এই ফুড ব্লগার গোষ্ঠীর সৌজন্যে বিজ্ঞাপনের বহর বেড়েছে; প্রচারে এসেছে দ্রুতি, জনচিত্তকে কামড়ে ধরার প্রকোপ; তাৎক্ষণিক খ্যাতির মহিমা কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও বিক্রেতাদের মধ্যে গড়ে তুলেছে এমন এক বাস্তুতন্ত্র যা একে-অপরকে সুবিধা প্রদানের শর্তে টিকে রয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় জাগে। কিন্তু খাবারের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার, যে-টাকায় যে-পরিমাণ খাবার দেওয়া হচ্ছে তা স্বাদের নিরিখে অনৌচিত্য দোষে দুষ্ট হয়েছে না হয়নি এসব বলার প্রয়োজন কখনও এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরগণ বোধ করেনি।
ফলে প্রশাসনের তরফে যখন খাদ্য সুরক্ষার মান খতিয়ে দেখার পালা শুরু হল, তখন ঝপাঝপ ঝাঁপ পড়ে গেল অসংখ্য খাবারের দোকানের। তাতে বড় নাম যেমন রয়েছে, রয়েছে তুলনায় অল্পপরিচিত প্রতিষ্ঠানও। গুণমানের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে এখনও বহু দোকান বন্ধ। পুজোর সময় খুলবে কি না, ধন্দ। যুক্তি-তর্কের পরিসরে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটররা কি ছাড়পত্র পেতে পারে? তারা মানুষের কাছে ‘খবর’ পৌঁছে দিয়েছে যখন, তখন খবরের ভাল-মন্দের দায় কেন নেবে না? না কি লাইকের নেশায় তারা গ্রাউন্ড রিপোর্টিংই করতে পারেনি ঠিক করে?
