সকালে আয়নায় মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, ত্বকের জেল্লা কমেছে? চোখের নীচে কালি পড়ছে, মুখ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে, আবার আঁচড়াতে গেলেই উঠে আসছে গোছা গোছা চুল? এই সব লক্ষণ দেখেই অনেকে সন্দেহ করছেন, শরীরে হয়তো আয়রনের ঘাটতি হয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় এই ধারণা থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ফেরিটিন ফেস’ (Ferritin Face) শব্দটি। কিন্তু সত্যিই কি মুখের চেহারা বলে দিতে পারে শরীরে আয়রনের ভাঁড়ারে টান পড়েছে কি না? নাকি এই প্রবণতার আড়ালে রয়েছে কিছু ভুল ধারণাও?
বিষয়টি বুঝতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে ফেরিটিন কী। এটি এমন একটি প্রোটিন, যা শরীরে আয়রন জমা রাখে এবং প্রয়োজনমতো তা ব্যবহারে সাহায্য করে। আয়রন আবার হিমোগ্লোবিন তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। লোহিত রক্তকণিকার এই প্রোটিন ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। ফলে শরীরে আয়রনের সঞ্চয় কমে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে একাধিক শারীরিক প্রক্রিয়ায়। ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর হলে দেখা দিতে পারে আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা।
তবে ‘ফেরিটিন ফেস’ কোনও স্বীকৃত চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা নয়। মুখের নির্দিষ্ট কোনও চেহারা দেখেই শরীরে ফেরিটিনের মাত্রা কমেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

মুখে ফুটে উঠতে পারে কোন লক্ষণ?
চিকিৎসকদের কথায়, শরীরে আয়রন ঘাটতির কারণে ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মুখ, ঠোঁট এবং চোখের পাতার ভিতরের অংশে এই পরিবর্তন নজরে পড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চোখের নীচে কালি, ত্বকের শুষ্কতা এবং চুল পড়ার সমস্যাও দেখা যায়।
কিন্তু এখানেই রয়েছে আসল রহস্য। এই প্রতিটি লক্ষণের পিছনেই থাকতে পারে একাধিক কারণ। চোখের নীচে কালি পড়ার সঙ্গে বংশগত বৈশিষ্ট্য, ঘুমের অভাব ও অ্যালার্জির সম্পর্ক থাকতে পারে। ত্বকের জেল্লা কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে শরীরে জলের ঘাটতি, আবহাওয়ার পরিবর্তন বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা। আবার মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন এবং অন্যান্য পুষ্টির অভাবেও চুল পড়তে পারে।
অর্থাৎ, মুখের চেহারায় পরিবর্তন দেখা দিলেই আয়রনের ঘাটতি হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ভুল। আবার বাইরে থেকে কোনও সমস্যা চোখে পড়ছে না বলে শরীরে আয়রনের মাত্রা ঠিক রয়েছে, তা-ও বলা যায় না।

রক্তাল্পতা না থাকলেও কমতে পারে ফেরিটিন
আয়রনের ঘাটতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শরীরে ফেরিটিন কমে যাওয়া আর রক্তাল্পতা এক নয়। প্রথমে শরীরে সঞ্চিত আয়রনের পরিমাণ কমতে পারে। পরবর্তী সময়ে ঘাটতি বাড়লে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, রক্তাল্পতা তৈরি হওয়ার আগেই শরীরে আয়রনের ভাঁড়ারে টান পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে কারও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও শরীরে আয়রনের সঞ্চয় কম থাকতে পারে। আবার আয়রনের ঘাটতি থেকে রক্তাল্পতা তৈরি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট বা সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু ফ্যাকাশে মুখ, চোখের নীচে কালি বা চুল পড়ার মতো লক্ষণের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। উপসর্গের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফলও বিবেচনা করতে হবে।

কোন পরীক্ষায় ধরা পড়বে ঘাটতি?
শরীরে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তপরীক্ষা করানো জরুরি। কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) পরীক্ষায় হিমোগ্লোবিন-সহ রক্তের বিভিন্ন উপাদানের অবস্থা বোঝা যায়। অন্যদিকে, সিরাম ফেরিটিন পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে সঞ্চিত আয়রনের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে ফেরিটিন পরীক্ষার ফল ব্যাখ্যা করার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শরীরে সংক্রমণ বা প্রদাহ থাকলে ফেরিটিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে রিপোর্টে ফেরিটিনের মাত্রা স্বাভাবিক দেখালেই সব ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি নেই বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসার ইতিহাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষার ফল মিলিয়ে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
আয়নায় মুখের চেহারার পরিবর্তন দেখে নিজে নিজে আয়রনের ঘাটতি নির্ণয় করা বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। ঘাটতি ধরা পড়লে কেন তা হচ্ছে, সেটাও খুঁজে দেখা জরুরি। কারণ, শুধু আয়রনের মাত্রা বাড়ানো নয়, সমস্যার পিছনে থাকা কারণের চিকিৎসাও প্রয়োজন।
