ডাকাতদের হাতে শুরু হয়েছিল পুজো। আজও মুসলিম পরিবারে তৈরি ভোগই প্রথম উৎসর্গ করা হয় দেবীকে। নেই আরতি ও পুষ্পাঞ্জলির রীতি। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পুজো হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাসস্থান সাগরদিঘির মণিগ্রামে। পরে জমিদার শরৎচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বহুরা গ্রামে আসেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, এক রাতে তিনি গভীর জঙ্গলে ডাকাতদের দ্বারা পূজিত একটি দুর্গাপ্রতিমা দেখতে পান। স্বপ্নাদেশে দেবীকে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আরাধনায় পরিবারের কোনও ত্রুটি না থাকলেও দেবী সন্তুষ্ট ছিলেন না। চিন্তিত হয়ে পড়েন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা। দেবী পুনরায় স্বপ্নাদেশে জানান, গ্রামের এক বিধবা মুসলিম মহিলার হাতের ভোগ চান। দেবীর স্বপ্নাদেশের পর বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার গ্রামের দরিদ্র মুসলিম বিধবা লোকায়ের মায়ের দ্বারস্থ হন। সব শুনে সেই প্রস্তাব প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি জানান, তাঁর অভাবের সংসার। একবেলা অনাহারে থাকতে হয়। তাঁর পক্ষে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। অবশেষে লোকার মা স্বয়ং স্বপ্নাদেশে দেবীর নির্দেশ পান। দেবীর নির্দেশ মেনে তিনি জঙ্গল থেকে কোদার খুদ কুড়িয়ে এনে কোদার নাড়ু, সিঁদুর, আলতা, লালপাড় সাদা শাড়ি, শাঁখা ও লোহার বালা দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করেন। দেবী সন্তুষ্ট হন। সেই থেকেই দেবীর নাম হয় ‘কোদাখাকি দুর্গা’। প্রাচীনকালে কাউন চালকে স্থানীয় ভাষায় ‘কোদা’ বলা হত। সেই রীতি মেনে আজও বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে প্রথম ভোগ নিবেদন করা হয় গ্রামের কোনও মুসলিম পরিবারের হাত থেকে। তাঁদের ভোগ উৎসর্গের পরই অন্যরা ভোগ দিতে পারেন।
এই পুজোর আরও ব্যতিক্রমী নিয়ম হল, মহালয়ার ১৪ দিন আগে ঘট বসিয়ে চণ্ডীপাঠ শুরু হয়, এখানে সন্ধ্যারতি বা অঞ্জলি হয় না, পুজো হয় সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে। সন্ধিপুজোর সময় পঞ্জিকা দেখে নয়, প্রদীপের শিখা উত্তর থেকে দক্ষিণে ঘুরে গেলেই নির্ধারিত হয়। আজও বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আত্মীয়রা বাংলাদেশ থেকেও দেবীর জন্য কোদার চাল পাঠিয়ে থাকেন। ৬০০ বছর ধরে এই পুজো প্রমাণ করে ভক্তি ও ভালোবাসার কাছে সব বিভেদ তুচ্ছ।
