সারাদিন মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ, একটানা ল্যাপটপে কাজ, চোখে অস্বস্তি হলেই নিজের মতো করে আই ড্রপ ব্যবহার, আবার দৃষ্টিতে সামান্য বদল এলেও ‘বয়সের কারণে’ বলে এড়িয়ে যাওয়া। চোখের ক্ষেত্রে এমন কিছু অভ্যাস রয়েছে, যেগুলিকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছি। অথচ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সেগুলি চোখের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে তাই চোখের যত্নে আমাদের রোজকার কোন ভুলগুলি হচ্ছে, সেগুলির দিকেই নজর দেওয়া জরুরি-
মোবাইলে চোখ আটকে, পলক পড়ছে কম
মোবাইলের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলে শুধু চোখের উপর চাপই পড়ে না, কমে যায় পলক ফেলার হারও। ফলে চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুষ্কতা, জ্বালা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তাই স্ক্রিন থেকে মাঝেমধ্যে চোখ সরানো জরুরি। শুধু চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড বসে থাকলেই হবে না। বরং দূরের কোনও জিনিসের দিকে তাকান। বিশেষ করে মোবাইলের মতো ছোট স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়মিত বিরতি নেওয়ার অভ্যাস করুন।
চোখে লেন্স, কিন্তু নিয়ম মানছেন তো?
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতাও চোখের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। লেন্স ঠিকমতো পরিষ্কার না করা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা বা চোখে অস্বস্তি হলেও লেন্স পরে থাকা, সবই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চোখ লাল হচ্ছে, জ্বালা করছে বা অস্বস্তি লাগছে? তখন কোনওভাবেই জোর করে লেন্স পরে থাকবেন না। লেন্স খুলে চশমা ব্যবহার করুন। প্রয়োজন হলে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার অপেক্ষা নয়
ছানির ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, চোখে ঝাপসা দেখা শুরু হলেই বুঝি সমস্যা হয়েছে। কিন্তু তার আগেও চোখে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন রং দেখার ক্ষেত্রে বদল, তীব্র আলোয় অস্বস্তি বা রাতে উলটো দিক থেকে আসা গাড়ির হেডলাইটে বেশি সমস্যা হওয়া। এই পরিবর্তনগুলি ধীরে ধীরে আসে বলে অনেকেই সেগুলি বয়সের স্বাভাবিক লক্ষণ ভেবে এড়িয়ে যান। দৃষ্টি অনেকটা ঝাপসা হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা না করে সময়মতো চোখ পরীক্ষা করানোই ভালো।
চোখ লাল? শুষ্ক? ‘এমনিই’ বলে এড়িয়ে যাবেন না
দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন দেখা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকার কারণে চোখ লাল বা শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা যদি বারবার হয় বা থেকে যায়, তাকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয় কোভিডের সময় মাস্ক পরার কারণে অনেকের চোখে শুষ্কতা ও জ্বালাভাব বেড়েছিল। মুখের গরম ও আর্দ্র বাতাস মাস্কের উপর দিয়ে চোখের দিকে উঠে এসে এমন সমস্যা তৈরি করত। অর্থাৎ, পরিবেশের ছোট পরিবর্তনও চোখের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাড়ির লোকের আই ড্রপ নিজের চোখে নয়
বাড়ির কারও চোখে সমস্যা হয়েছে, আপনারও একই রকম লাগছে, তাই তাঁর আই ড্রপ ব্যবহার করে নিলেন। এই অভ্যাস একেবারেই ঠিক নয়। ড্রপের বোতলের মুখ চোখ বা আশপাশে লেগে গেলে সেটি জীবাণুতে দূষিত হতে পারে। তাই অন্যের সঙ্গে আই ড্রপ শেয়ার করে নেওয়া উচিত নয়। কোনও ড্রপ কতদিন ধরে খোলা রয়েছে, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের মতো করে আই ড্রপ ব্যবহার করবেন না।

সন্তান শুধু ঘরে, চোখের ফোকাসও সারাক্ষণ কাছে
সন্তানের চোখ ভালো রাখতে শুধু মোবাইল বা টিভির সময় কমালেই হবে না। তাকে নিয়মিত বাইরে খেলতে পাঠানোও জরুরি। সারাদিন পড়াশোনা, বই বা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখকে বারবার কাছের জিনিসেই ফোকাস করতে হয়। বাইরে খেলাধুলার সময় দূরের জিনিস দেখার সুযোগ পায় চোখ। তাই শিশুদের প্রতিদিন কিছুটা সময় বাইরে কাটানোর অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
ফোনটা হঠাৎ দূরে সরিয়ে ধরছেন?
৪০-এর কোঠায় এসে অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়। ফোনের লেখা পড়তে হাত একটু দূরে সরিয়ে নিতে হচ্ছে, বই পড়তে আগের চেয়ে বেশি আলো দরকার হচ্ছে, ছোট হরফ স্পষ্ট দেখতে কষ্ট হচ্ছে। এগুলিকে শুধুই ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাবেন না। চোখে বয়সজনিত পরিবর্তনের লক্ষণ হতে পারে এগুলি। চোখ পরীক্ষা করালে বোঝা যাবে পড়ার জন্য চশমা প্রয়োজন কি না, নাকি অন্য কোনও সমস্যা রয়েছে।

দেখতে পাচ্ছেন বলেই চোখ সুস্থ, এমন নয়
চোখের সমস্যা হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অভ্যাসও বড় ভুল। কারণ অনেক চোখের সমস্যা শুরুতে স্পষ্ট কোনও উপসর্গ তৈরি করে না। তাই বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো জরুরি। ঝুঁকির কারণ থাকলে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। চোখের যত্ন মানে শুধু সমস্যা হলে চিকিৎসা নয়, সমস্যা হওয়ার আগেই নজর রাখা।
চোখ প্রতিদিন নিঃশব্দে কাজ করে। তাই তার যত্নেও অবহেলা নয়। নিয়মিত পলক ফেলুন, স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে দূরে তাকান, শিশুদের বাইরে খেলতে দিন, কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারে নিয়ম মানুন এবং দৃষ্টিশক্তিতে সামান্য পরিবর্তন হলে, তা এড়িয়ে যাবেন না। বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে চোখের প্রতি এইটুকু সচেতনতাই হয়ে উঠুক সবচেয়ে জরুরি অভ্যাস।
