Hashtagintro

হিন্দি ছবির ‘সেক্স টয়’ নায়ক-নায়িকা, বাণিজ্য-মোক্ষের উপর নানার বৈপ্লবিক ‘প্রহার’

কোনও কোনও অভিনেতাকে ফ্রেমে পেলে ক্যামেরা যেন আর কাউকে দেখতে পায় না! পাশে দাঁড়ানো ‘হ্যান্ডসাম হিরো’, ‘সুন্দরী হিরোইন’ও ম্লান! শুধুমাত্র ম্যানারিজমেও (চোখ-মুখ, হাত-পায়ের বহুস্তরীয় ভঙ্গিতে) মুগ্ধ দর্শক। কথা বললে তো ষোলো আনার উপর আঠারো আনা দৃশ্য-দখল। বাংলা ছবিতে তুলসী চক্রবর্তী, উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, জহর রায় উদাহরণ হতে পারে, হিন্দি ছবিতে একইরকম ‘জাদুকর-অভিনেতা’ ছিলেন ওম পুরি। ইতিমধ্যে তাঁকে হারিয়েছি আমরা। এবার বাঙালি কবি উৎপলকুমার বসু কথিত ‘ব্যক্তিগত লিখন ভঙ্গিমা’ (পড়ুন অভিনয় ভঙ্গিমা) পকেটে পুরে ‘প্রহার’ নানা পাটেকরও চলে গেলেন! হ্যাঁ, নানা পাটেকর নামটা বললেই নয়ের দশকে হাইস্কুল ছোঁয়া একটি প্রজন্মের ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রহার’ ছবিটির কথাই মনে পড়ে।

আসলে ১৯৯১ সালটা ভারতীয় সিনেমার জন্য ইন্টারেস্টিং। সে বছরই মুক্তি পেল লরেন্স ডিসুজা পরিচালিত ‘সাজন’। সঞ্জয় দত্ত-মাধুরী দীক্ষিত-সলমান খানের ত্রিকোণ প্রেমে মজল আসমুদ্রহিমাচল। একই বছরে সুভাষ ঘাই পরিচালিত ‘সওদাগর’ তুফান তুলল। হিন্দি ছবি পেল স্বপ্নসুন্দরী ও শক্তিশালী অভিনেত্রীর ‘টু-ইন-ওয়ান’ প্যাক—মণীষা কৈরালাকে। মহেশ ভাটের ‘সড়ক’, যশ চোপড়ার ‘লমহে’-ও একই বছরে হলে এসেছিল। এর চেয়েও চমকে দেওয়া কাণ্ড হল স্বয়ং সত্যজিৎ রায় এবং বাংলাদেশের জনৈক পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুলের আজব কাণ্ড। সত্যজিতের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ মুক্তি পায় ১৯৯১ সালেই। এবং সেই বছরই দুই বাংলাকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে বাণিজ্যিক বাংলা ছবির সর্বকালের রেকর্ড করে চিরঞ্জিৎ, অঞ্জু ঘোষ অভিনীত তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ নামের একটি অতি অতি অতি নিকৃষ্ট মানের সিনেমা।

সেনা প্রশিক্ষণের বিষয়টি পরবর্তীকালের বলিউডের সিনেমায় বিচ্ছিন্নভাবে আসলেও ‘প্রহার’-এই সম্ভবত প্রথম।

যদিও ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ নয়, ‘প্রহার’-এর সাহসকে ব্যাখ্যা করতে হলে পাশে ফেলতে হবে ‘সাজন’, ‘সওদাগর’ কিংবা ‘সড়ক’কে। ‘নায়ক-নায়িকা-ভিলেন-কমেডিয়ান’-এর জনপ্রিয় প্যাকেজের উলটো দিকে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছিল ‘প্রহার’। ‘রসকষহীন’ নানা পাটেকর নিজেই নায়ক, তিনিই ছবির গল্প, চিত্রনাট্যের অন্যতম কুশিলব। পরিচালক তো বটেই। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখেছিলাম, গল্পের গরুকে গাছে না তুলেও, মাধুরী দীক্ষিত, ডিম্পল কাপাডিয়াকে ‘অবলা নারী’ কিংবা ‘সিনিক বিউটি’ না বানিয়েও টানটান ছবি তৈরি করা যায়! ‘বীরত্ব’, ‘সততা’, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ’ মার্কা প্লট হিন্দি ছবিতে আগেও ছিল, কিন্তু তা ছিল অতিমানবীয় নকল। একজন পেটাতো পঞ্চাশ জনকে। সেখানে ‘প্রহার’-এর কাহিনি দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। আমরা হিন্দি সিনেমার ‘রূপকথা’র মাঝে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম— যুক্তি, বুদ্ধি, চেতনা, অতিচেতনাকে।

‘প্রহার’ ছবিতে মেজর চৌহানের ভূমিকায় নানা পাটেকর।

সেনা প্রশিক্ষণের বিষয়টি পরবর্তীকালের বলিউডের সিনেমায় বিচ্ছিন্নভাবে আসলেও ‘প্রহার’-এই সম্ভবত প্রথম। যেখানে ডিটেল-এ দেখানো হয়েছে— যে ঘুষিতে তিনটি দাঁত ভেঙে যেতে পারে, সেই মুষ্টিকে শক্তপোক্ত করতে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। রাষ্ট্রবাদের উগ্রতা আর নিজের সমাজ, দেশকে ভালোবাসা যে এক নয়, তাও নানা পাটেকর লিখিত, অভিনীত ও পরিচালিত ‘প্রহার’ একটি প্রজন্মকে শিখিয়েছিল। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া রামগোপাল ভর্মা পরিচালিত ‘সত্যা’র মতোই মোড় ঘোরানো ছবি হতে পারত ছ’বছর আগেই তৈরি ‘প্রহার’। হয়নি যে সেটা হিন্দি ছবি এবং ভারতীয় সিনেমার দর্শকদের দুর্ভাগ্য। তাতে নানা পাটেকরের কী-বা আসে যায়!

‘খামোশি’র অসামান্য অভিনয়ের পরেও স্টিরিওটাইপ নানাকেই ‘গুলামে মুস্তাফা’ নামের চড়া দাগের ছবিতে খোঁজে বাণিজ্যিক হিন্দি ছবি। তিন-তিনটে জাতীয় পুরস্কারেও কাজ হয় না!

তিনি ‘জিন্দেগি লম্বি নেহি, বড়ি হোনি চাহিয়ে’র শর্ত পূরণ করেই প্রয়াত হলেন। আটের দশকের শুরুতে যখন মারাঠি থিয়েটারের পাঠশালা ডিঙিয়ে হিন্দি ইন্ডাস্ট্রির অংশ হয়েছিলেন, তখন একজন নিটোল অভিনেতার জন্য সুখের, আনন্দের সময় ছিল না। আজকের মনোজ বাজপেয়ী, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠীরা অভিনয়ের যে মঞ্চ পেয়েছেন, সেই মঞ্চ বাঁধার অন্যতম কারিগর ছিলেন নানা পাটেকর। তাই ‘প্রহার’ করার পরেও ‘ক্রান্তিবীর’, ‘ত্রিরঙ্গা’র মতো অতি অভিনয়ে (হতে পারে অতি অভিনয়ই নানার ব্যক্তিগত অভিনয় ভঙ্গিমা) টিকে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ‘খামোশি’র অসামান্য কাজের পরেও স্টিরিওটাইপ নানাকেই ‘গুলামে মুস্তাফা’ নামের চড়া দাগের ছবিতে খোঁজে বাণিজ্যিক হিন্দি ছবি। তিন-তিনটে জাতীয় পুরস্কারেও কাজ হয় না!

যদিও দিনশেষে ঝরে যায় এইসব শুকনো পাতা! নানাকে দেখতে ইচ্ছে করলেই আমরা ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’ কি ‘রাজনীতি’ খুলে বসব, ‘অপহরণ’ বা ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ চালাব, কখনও বা ‘অব তক ছপ্পন’ অথবা ‘পরিন্দা’ দেখবো, কিংবা ‘দ্যা অ্য়াটক ২৬/১১’-ও রয়েছে। মর্গের মধ্যে আজমল কাসভকে দেওয়া সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া পুলিশ আধিকারিকের স্পিচ। মন ভালো করতে ‘ওয়েলকাম’-এর একটা-দুটো সিনও দেখে নিতেই পারি। সর্বপরি বারবার ফিরে যাবো সেই ১৯৯১ সালে। অপার মুগ্ধতায় দেখব— বাণিজ্যকে মোক্ষ করা, নায়ক-নায়িকাকে ‘সেক্স টয়’ বানানো হিন্দি ইন্ডাস্ট্রির উপর নানা পাটেকরের আশ্চর্য, বৈপ্লবিক ‘প্রহার’।

Source: Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language