কাশফুলে ভরা মাঠ। পিছনে হেলে পড়ছে সূর্য। মাঝে বসে এক যুবক। কোলে রাখা কাঠের টুকরো। সেই কাঠের উপর পেনসিল দিয়ে আঁকা একজনের মুখ। হাতে রয়েছে একটি আতস কাঁচ। রোদের দিকে আতস কাচ ধরতেই সূর্যের আলো এসে এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে। সেই ফোকাস পড়ছে কাঠের উপর। পুড়ছে কাঠ। ধোঁয়া উঠছে। ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে চোখ, নাক, মুখ, চুল, দাড়ি। একটু এদিক-ওদিক হলেই পুরো ছবিটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অসম্ভব ধৈর্য আর মনোযোগ দিয়ে একটানা কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পী।
অঙ্কন শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ভাঙে অর্থাভাবে। দমে না গিয়ে প্রকৃতিকেই সামগ্রী বানালেন মুর্শিদাবাদের যুবক! কোনও তুলি নয়, কোনও দামি রং নয়, কোনও ইলেকট্রিক মেশিনও নয়। সম্বল শুধু সূর্যের আলো আর একটা আতস কাচ। সূর্যের আলো কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করল মানুষের মুখ। সেই কাণ্ড ঘটিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিলেন জিয়াগঞ্জ ব্লকের কাপাসডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েতের শিবনগরের যুবক নাসিরুদ্দিন শেখ।
ছেলেবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল একটাই। সরকারি কলেজ থেকে পড়াশোনা করে অঙ্কনের শিক্ষক হবেন। ছবি আঁকাকে পেশা করবেন। নতুনদের শেখাবেন। একটা সময় সেই সুযোগও আসে। কিন্তু ভাগ্যদেবতা অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন। পড়াশোনার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াল অভাব। দুয়ারে যখন অর্থাভাব, পড়াশোনা তখন বিলাসিতা! সংসারের হাল ধরতে ভেঙে গেল বহুদিনের লালিত স্বপ্ন! হেরে গিয়েও হার মানেননি নাসিরুদ্দিন। রং-তুলির খরচ বাঁচাতে সূর্যের আলোকেই বানালেন তুলি। শুধু তাই নয়, রঙের পরিবর্তে তিনি ছবি আঁকেন ইটের টুকরো, তুষ, চাল, তিল, মাটি, সিমেন্ট দিয়ে। যা হাতের কাছে পান, তাই দিয়েই ফুটিয়ে তোলেন ছবি।
সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সূর্যের আলো ও আতস কাচের সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন অপরূপ কলা। নাসিরুদ্দিন বলেন, “ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকা আমার নেশা। সরকারি কলেজে সুযোগও পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে পড়া ছাড়তে হয়। তখন মনে হয়েছিল, রং-তুলি কিনতে না পারলে কী হবে, সূর্যের আলো দিয়ে তো ছবি আঁকা যায়। ইটের গুঁড়ো, তুষ, চাল, তিল, মাটি, সিমেন্ট দিয়েও তো রং করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই এই কাজ শুরু করি।”

ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার পর শেষে দেখা গেল সম্পূর্ণ ছবিটি। কাঠের উপর ফুটে উঠেছে দাড়িওয়ালা এক যুবকের স্পষ্ট প্রতিকৃতি। সেই ছবির যুবকই হলেন ‘রক্তযোদ্ধা’ নামে পরিচিত সঞ্জীব দাস। নিজের প্রতিকৃতি দেখে আবেগে আপ্লুত সঞ্জীব দাস। তিনি বলেন, “আমি সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছি। রক্তদান করি মানুষের পাশে দাঁড়াব বলে, কখনও ভাবিনি কেউ আমার ছবি এভাবে আঁকবে। তাও আবার রং-তুলি ছাড়া, শুধু সূর্যের আলো আর আতস কাঁচ দিয়ে। নাসিরুদ্দিনের হাতে জাদু আছে। অভাবের মধ্যেও ও হার মানেনি, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। ওর এই প্রতিভা যেন সঠিক মর্যাদা পায়, আমি চাই প্রশাসন ওঁর পাশে দাঁড়াক।”
