‘ডুব দে রে মন কালী বলে, হৃদি-রত্নাকর অগাধ জলে। রত্নাকর নয় শূন্য কখন, দু-চার ডুবে ধন না পেলে।’ সাধক রামপ্রসাদ সেনের গানের এই কয়েকটি পঙ্ক্তির মধ্যে বাংলার শাক্তসাধনার এক চিরন্তন সত্য লুকিয়ে রয়েছে। দেবীকে পাওয়ার জন্য মানুষ কত পথেই না ঘুরে বেড়ায়! কেউ খোঁজে শাস্ত্রের পাতায়, কেউ কঠিন তন্ত্রসাধনায়, কেউ বা নির্জন শ্মশানের অন্ধকারে। অথচ রামপ্রসাদ বারবার ফিরিয়ে এনেছেন মানুষকে তাঁর নিজের হৃদয়ের কাছে। তাঁর কাছে কালী ঘরের মা, যাঁর কাছে অভিমান করা যায়, দুঃখের কথা বলা যায়, এমনকী নিজের সমস্ত ব্যর্থতা নিয়েও আশ্রয় চাওয়া যায়।
উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়ায় অবস্থিত তারাশংকরী পীঠের ইতিহাস পড়তে গিয়ে রামপ্রসাদের সেই মাতৃসাধনার কথাই বারবার মনে পড়ে। কারণ এই মন্দিরের পরিচয় শুধু একটি দেবীমন্দিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গর্ভগৃহে রয়েছে তন্ত্রসাধনার বিশেষ পরম্পরা, রয়েছে কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটের অগ্নির স্মৃতি, রয়েছে নবমুণ্ডি আসন। আবার একই প্রাঙ্গণে পূজিত হচ্ছেন শ্রীশ্রী যশোমাধব এবং বাবা মহাকাল ভৈরব। শাক্ত, বৈষ্ণব ও শৈব, তিনটি পৃথক সাধনধারা এখানে এসে যেন এক আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্র তৈরি করেছে। কলকাতার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মধ্যে এই মন্দিরের অবস্থানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বেলগাছিয়া রেল কলোনির শান্ত পরিবেশে, দক্ষিণদাঁড়ি রেলওয়ে কলোনির ১৪৩ ও ১৪৪ নম্বর ঠিকানায় অবস্থিত এই পীঠের সূচনা হয়েছিল একান্ত ব্যক্তিগত সাধনা ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। আজকের প্রতিষ্ঠানের যে বিস্তৃত ধর্মীয় পরিচয়, তার পিছনে রয়েছে এক সাধক দম্পতির দীর্ঘ সাধনজীবন।
একটি টিনের চালাঘর থেকে সাধনপীঠ
১৯৫৪ সাল। যোগীরাজ শ্রীশ্রী পরেশচন্দ্র রায়মৌলিকের উদ্যোগে বেলগাছিয়ায় একটি ছোট্ট টিনের চালাঘরে মা কালীর নিত্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়। তখনও কেউ হয়তো ভাবেননি, এই সামান্য উপাসনাস্থল একদিন কলকাতার একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। পরের বছর, ১৯৫৫ সালে, সেখানে নির্মিত হয় পাকা মন্দির। এই প্রতিষ্ঠার কাজে যোগীরাজের পাশে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী যোগমাতা শ্রীমতী অঞ্জলি রায়মৌলিক। তাঁদের সাধনা, নিষ্ঠা ও ভক্তদের সহযোগিতায় ক্রমে মন্দিরের পরিসর ও ধর্মীয় কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। প্রতিষ্ঠাতাদের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে কেবল পূজাপদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটানো এবং বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান থেকে প্রকৃত আত্মোপলব্ধির দিকে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এখানে পূজা যেন নিছক কিছু নিয়ম পালনের মধ্যে আটকে না থাকে, বরং মানুষের জীবন ও মননকে পরিশুদ্ধ করার পথ হয়ে ওঠে।

মা তারাশংকরী দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যার আরাধনা
তারাশংকরী পীঠের প্রধান আরাধ্যা দেবী মা তারা। হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রে দশমহাবিদ্যার মধ্যে দেবী তারার স্থান দ্বিতীয়। দশমহাবিদ্যা বলতে আদ্যাশক্তির দশটি মহাজ্ঞানময়ী রূপকে বোঝায়। কালী, তারা, ত্রিপুরাসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও কমলা, এই দশটি রূপের প্রত্যেকটির নিজস্ব সাধনাতত্ত্ব ও প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। দেবী তারার নামের মধ্যেই রয়েছে তাঁর বিশেষ পরিচয়। ‘তারা’ অর্থাৎ যিনি পার করিয়ে দেন। সংসারের দুঃখ, অজ্ঞান, ভয় ও বন্ধন থেকে যিনি জীবকে উদ্ধার করেন, তিনিই তারা। তিনি ভক্তের কাছে আশ্রয়দাত্রী, বিপদতারিণী এবং মুক্তির পথপ্রদর্শক। তারাশংকরী পীঠে দেবী পূজিতা হন একজটা, উগ্রতারা ও নীলসরস্বতী, এই তিনটি বিশেষ রূপে। এখানে দেবী নীলবর্ণা। তাঁর হাতে রয়েছে পদ্ম, করোটি, খড়্গ ও অন্যান্য অস্ত্র। তিনি শিবের উপর দণ্ডায়মান এবং তাঁর ভৈরব অক্ষোভ্য ভৈরব। দেবীর এই রূপের মধ্যে যেমন তন্ত্রের গূঢ় প্রতীক রয়েছে, তেমনই রয়েছে অজ্ঞান ও অশুভ শক্তির বিনাশের দর্শন। বাংলার শাক্তসাধনার ইতিহাসে দেবী তারার সঙ্গে শ্মশানভাবনার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্মশান মানুষের কাছে ভয়ের স্থান, কিন্তু সাধকের কাছে তা জীবনের অনিত্যতার পাঠশালা। সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে পারে, যে সংসার, সম্পদ, ক্ষমতা ও অহংকার নিয়ে এত আয়োজন, তার কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় আত্মসমর্পণ।
সাধক রামপ্রসাদ সেনের মাতৃসাধনার মধ্যেও এই আত্মসমর্পণের সুর স্পষ্ট। তিনি লিখেছিলেন-“আমায় দে মা পাগল করে, আর কাজ নাই জ্ঞানবিচারে।” এখানে জ্ঞান হৃদয়ের ব্যাকুলতার ধারক হয়ে উঠেছে। চাই এমন এক প্রেম, যেখানে ভক্ত নিজের অহংকার ভুলে মায়ের কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত হতে পারে। ১৯৫৮ সালে যোগীরাজ পরেশচন্দ্র রায়মৌলিক ও যোগমাতা অঞ্জলি রায়মৌলিক তন্ত্রপদ্ধতিতে দেবী তারার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে নবমুণ্ডি আসন। মন্দির কর্তৃপক্ষের বিবরণ অনুসারে, প্রতিষ্ঠাতা সাধক ও যোগমাতা এই আসনে বসেই দেবীর সাধনা করতেন। আজও এখানে প্রতিদিন তন্ত্রমতে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা সাতটায় দেবীর আরতি হয়।
নবমুণ্ডি আসন ও তন্ত্রসাধনার গূঢ় তাৎপর্য
তারাশংকরী পীঠের ইতিহাসে নবমুণ্ডি আসনের উল্লেখ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মন্দিরের গর্ভগৃহে এমন আসন দেখা যায় না। তন্ত্রসাধনার বিভিন্ন ধারায় মুণ্ডাসন বা শ্মশানসাধনার উল্লেখ রয়েছে। এই সাধনপদ্ধতির বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত দর্শন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সবচেয়ে বড় বাধা তার নিজের অহংকার, ভয়, কামনা ও আসক্তি। তন্ত্রসাধনার প্রতীকী ভাষায় এই বাধাগুলিকে অতিক্রম করার কথা বলা হয়েছে। মৃত্যু ও অনিত্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করাই এই সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তারাশংকরী পীঠের নবমুণ্ডি আসন তাই প্রতিষ্ঠাতা দম্পতির সাধনজীবনের স্মারক। তন্ত্রসাধনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পূজার পদ্ধতি। দক্ষিণাচার ও বামাচার, এই দুই ধারার গুরুত্ব এই পূজা পদ্ধতির স্বাতন্ত্র নির্মাণ করে। দক্ষিণাচারকে সেখানে সাত্ত্বিক উপাসনাপদ্ধতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে হিংসা বা রক্তপাতের স্থান নেই। ভক্তি, সংযম, শুদ্ধতা ও সর্বজনীন কল্যাণের ভাবনাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে বামাচার তন্ত্রের একটি পৃথক সাধনধারা, যেখানে পঞ্চমকারের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এই দুই পদ্ধতির আলোচনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয় যে, মন্দিরে উভয় পদ্ধতিই অনুসৃত হয়। সেখানে কাম, ক্রোধ প্রভৃতি রিপুকে জয় করার প্রয়োজনীয়তার উপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এখানেই তন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য। সাধনা প্রকৃত অর্থে নিজের ভিতরের পশুত্বকে অতিক্রম করা|
মণিকর্ণিকার অগ্নি এল কাশীর মহাশ্মশান থেকে বেলগাছিয়ার গর্ভগৃহে
তারাশংকরী পীঠের অন্যতম বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য গর্ভগৃহে সংরক্ষিত অগ্নিকুণ্ড। কাশীর পবিত্র মণিকর্ণিকা ঘাট থেকে আনা অগ্নি এখানে প্রজ্বলিত রয়েছে। এই অগ্নিকে কেন্দ্র করে মন্দিরের একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটের নাম উচ্চারণ করলেই ভারতীয় ধর্মীয় চেতনার এক প্রাচীন ছবি ভেসে ওঠে। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই মহাশ্মশান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দুদের কাছে মুক্তিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে প্রতিদিন জীবনের শেষ যাত্রা সম্পন্ন হয়। চিতার আগুন কখনও নেভে না, এই ধারণা মণিকর্ণিকাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে রয়েছে। তারাশংকরী পীঠে সেই অগ্নির উপস্থিতি যেন কাশীর সঙ্গে বেলগাছিয়ার এক আধ্যাত্মিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। আগুন এখানে শুদ্ধি, ত্যাগ, সাধনা ও চিরন্তনতার প্রতীক। তবে অগ্নিটির সূচনাকাল সম্পর্কে দুটি পৃথক বিবরণ রয়েছে। কেউ বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে অগ্নি প্রজ্বলিত থাকার কথা| কেউ বলে বিংশ শতকের ষাটের দশকে এই আগুন জালানো হয়েছিল|
ধামরাইয়ের যশোমাধব পূর্ববঙ্গের এক প্রাচীন ঐতিহ্যের কলকাতায় পুনর্জন্ম
তারাশংকরী পীঠের ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায় সম্ভবত শ্রীশ্রী যশোমাধবের উপাসনা। দেবী তারার তন্ত্রসাধনার পাশাপাশি এখানে যে বৈষ্ণব উপাসনার ধারা প্রবাহিত, তার শিকড় রয়েছে বাংলাদেশের ধামরাইয়ের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যে। কলকাতার বেলগাছিয়ার সঙ্গে ঢাকার অদূরের ধামরাইয়ের এই যোগসূত্র রয়েছে, রয়েছে বংশপরম্পরায় বহন করে আনা ধর্মীয় বিশ্বাস, দেশভাগের স্মৃতি এবং বহু শতাব্দী পুরনো একটি উৎসবকে নতুন ভূখণ্ডে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। যশোমাধবের আবির্ভাব সম্পর্কে একটি প্রাচীন কাহিনি বর্ণিত হয় লোকমুখে। কথিত আছে, পালবংশের শেষদিকের রাজা যশোপাল একদিন রাজহস্তীতে চড়ে গ্রামাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি মাটির ঢিবির সামনে এসে হাতিটি থেমে যায়। বহু চেষ্টা করেও তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। রাজা বিষয়টিকে সাধারণ ঘটনা বলে মনে করেননি। তাঁর নির্দেশে সেই স্থান খনন করা হলে মাটির নীচ থেকে বিষ্ণুমূর্তি আবিষ্কৃত হয়। ধামরাইয়ের পণ্ডিত শ্রী রামজীবন রায় বিগ্রহটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পূজার ব্যবস্থা করেন। রাজা যশোপালের নাম অনুসারেই দেবতার নাম রাখা হয় শ্রীশ্রী যশোমাধব। বাংলা ১০৭৯ সাল থেকে ধামরাইয়ে যশোমাধবের রথযাত্রার প্রচলন হয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে এই উৎসব স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
মনে পড়ে একটি জনপদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার কথা। রথের দিন গ্রামের মানুষ একত্রিত হতেন, কীর্তনের ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত পথঘাট, উৎসবকে ঘিরে বসত মেলা। ধর্মীয় আচার ও সামাজিক আনন্দের মধ্যে কোনও বিভাজন ছিল না। যশোমাধবের রথ ছিল সকলের মিলনের উপলক্ষ। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের উপর এক গভীর আঘাত হানে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে ধামরাইয়ের মূল যশোমাধব বিগ্রহ অপবিত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঐতিহাসিক রথটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। যে রথ একসময় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভক্তদের আনন্দ ও বিশ্বাসের বাহন ছিল, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কিন্তু ইতিহাসের কোনও ধ্বংসই শেষ কথা নয়। মানুষের বিশ্বাস অনেক সময় ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় হাইকমিশনের সহযোগিতা এবং স্থানীয় ভক্তসমাজের উদ্যোগে বিগ্রহ পুনরুদ্ধার ও রথ পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা হয়। ভক্তদের কাছে এই প্রয়াস ছিল তাঁদের বহু প্রজন্মের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম।
রামজীবন রায়ের বংশধর যোগীরাজ ধামরাই থেকে বেলগাছিয়া এলেন
যশোমাধবের ইতিহাসের সঙ্গে যোগীরাজ পরেশচন্দ্র রায়মৌলিকের পারিবারিক সম্পর্ক এই পীঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্রগুলির একটি। তাঁকে ধামরাইয়ের পণ্ডিত রামজীবন রায়ের সরাসরি বংশধর বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের পরিবার স্বাধীনতার আগেই কলকাতায় বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু স্থান পরিবর্তন হলেও পূর্ববঙ্গের পারিবারিক ধর্মীয় ঐতিহ্য তাঁদের জীবন থেকে মুছে যায়নি। ধামরাইয়ের যশোমাধব তাঁদের কাছে শুধু পারিবারিক উপাস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন পূর্বপুরুষের স্মৃতি, বংশপরম্পরার বিশ্বাস এবং একটি হারিয়ে যাওয়া জনপদের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের প্রতীক। যোগীরাজ ও যোগমাতা অনুভব করেছিলেন, কলকাতায় যশোমাধবের উপাসনার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হওয়া প্রয়োজন। এই সিদ্ধান্তের পিছনে দৈবাদেশ ও গভীর অন্তরের আহ্বানের কথা শোনা যায়। তাঁরা একটি বিশেষ সংকল্প গ্রহণ করেন। যশোমাধবের উদ্দেশে এক কোটি তুলসিপাতা নিবেদন করবেন। প্রতিটি তুলসিপাতা মন্ত্রপূত করে নিবেদনের এই বিশাল আয়োজন নিছক কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, এর মধ্যে ছিল দীর্ঘ সময়ের ভক্তি, ধৈর্য ও আত্মনিবেদনের পরিচয়। অবশেষে ১৯৭৮ সালের মাঘী পূর্ণিমায় সেই সংকল্প পূর্ণ হয়। এক কোটি তুলসিপাতা নিবেদনের পর বেলগাছিয়ার তারাশংকরী পীঠে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী যশোমাধবের বিগ্রহ। বিগ্রহের দুই পাশে অধিষ্ঠিতা লক্ষ্মী ও সরস্বতী। সঙ্গে রয়েছেন কানাই ও বলাই। প্রতিদিন বৈষ্ণব রীতিতে দেবতার পূজা হয়। মাঘী পূর্ণিমা, রথযাত্রা ও জন্মাষ্টমী বিশেষভাবে পালিত হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় যশোমাধবের আরতি অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনাটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনেক গভীর। দেশভাগের ফলে কত পরিবার যে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি, মন্দির, দেববিগ্রহ ও সামাজিক পরিমণ্ডল ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল, তার কোনও পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে, অনেক উপাসনাকেন্দ্র নিশ্চিহ্ন হয়েছে। কিন্তু যোগীরাজ পরেশচন্দ্র রায়মৌলিকের উদ্যোগে ধামরাইয়ের যশোমাধবের উপাসনা নতুন করে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এক অর্থে, এটি পূর্ববঙ্গের একটি প্রাচীন ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
রথযাত্রায় বেলগাছিয়া থেকে হাতিবাগান
আজও তারাশংকরী পীঠের অন্যতম প্রধান বার্ষিক উৎসব শ্রীশ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা। এই উৎসবের মধ্যে রয়েছে ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি, ধর্মীয় আবেগ এবং উত্তর কলকাতার নিজস্ব নাগরিক সংস্কৃতির এক সুন্দর মেলবন্ধন। প্রতি বছর রথযাত্রার দিন বেলগাছিয়ার মন্দির থেকে সুসজ্জিত রথে করে যশোমাধবকে নিয়ে যাওয়া হয় হাতিবাগানে, স্টার থিয়েটারের বিপরীতে অবস্থিত মাধববাড়িতে। সেখানে নয় দিন ধরে চলে দেবতার পূজা, আরতি, কীর্তন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান। উলটোরথের দিন আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয় তারাশংকরী পীঠে। এই উৎসবের একটি বিশেষ রীতি রয়েছে। বছরের অন্য সময় ভক্তরা দূর থেকে দেবতার দর্শন করেন। কিন্তু রথযাত্রার দিন তাঁরা যশোমাধবের চরণ স্পর্শ করার সুযোগ পান। বহু ভক্তের কাছে সারা বছরের অপেক্ষা যেন এই একটি দিনের জন্য। কেউ আসেন মানত পূরণ করতে, কেউ কৃতজ্ঞতা জানাতে, কেউ বা মনের অপ্রকাশিত দুঃখ দেবতার চরণে নিবেদন করতে। রথযাত্রার দিন বিকেলে মন্দিরের অভ্যন্তরীণ পূজা ও অভ্যর্থনার আচার সম্পন্ন হওয়ার পর বিগ্রহকে রথে অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রথযাত্রা শুরু হয়। রথ পৌঁছয় হাতিবাগানের মাধববাড়িতে। সেখানে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যরা দেবতাকে গ্রহণ করেন। ওয়েবসাইটের বিবরণে শ্রীমধুসূদন রায়ের পরিবারের এই অভ্যর্থনা ও ঐতিহ্য রক্ষার ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নয় দিন ধরে মাধববাড়িতে চলে নিত্যপূজা, আরতি, কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা এবং ভক্তদের জন্য প্রসাদ ও সেবার ব্যবস্থা। উলটোরথের দিন একই ভক্তিময় পরিবেশে যশোমাধব ফিরে আসেন বেলগাছিয়ার মূল মন্দিরে। রথের রশি টানার মুহূর্তটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে ধনী-দরিদ্র, পরিচিত-অপরিচিত, নানা পেশা ও সামাজিক অবস্থানের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ান। কেউ রশি টানেন, কেউ কীর্তন করেন, কেউ শুধু হাত জোড় করে রথের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। ধামরাইয়ের প্রাচীন রথযাত্রা থেকে বেলগাছিয়ার এই উৎসবের মধ্যে তাই শুধু ধর্মীয় ধারাবাহিকতা নয়, রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। একসময় যে ঐতিহ্য পূর্ববঙ্গের মাটিতে বিকশিত হয়েছিল, আজ তা কলকাতার রাজপথে নতুন করে জীবন্ত।
বাবা মহাকাল ভৈরব সময়, মৃত্যু ও মহাশক্তির আরাধনা
তারাশংকরী পীঠের তৃতীয় আরাধ্য বাবা মহাকাল ভৈরব। দেবী তারা ও যশোমাধবের পাশাপাশি তাঁর স্বতন্ত্র বিগ্রহের উপস্থিতি মন্দিরটিকে আরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ১৯৮৪ সালের মকর সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে যোগীরাজ পরেশচন্দ্র রায়মৌলিক ও যোগমাতা অঞ্জলি রায়মৌলিক মহাকাল ভৈরবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। বিগ্রহটির সঙ্গে নেপালের কাঠমান্ডুর বিখ্যাত কালভৈরব মূর্তির সাদৃশ্য রয়েছে। মহাকাল ভৈরবের বিগ্রহ ছয় হাতবিশিষ্ট। তাঁর হাতে রয়েছে খড়্গ, ত্রিশূল, কপাল, চক্র এবং ব্রহ্মার ছিন্ন পঞ্চম মুণ্ডের প্রতীক। একটি হাত ভক্তদের অভয়দান করছে। মাথায় পাঁচটি মানবমুণ্ডের মুকুট, হাতে ও কোমরে সর্পালংকার। বিগ্রহের চারপাশে রয়েছে মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর ভেড়াঘাট থেকে আনা বারোটি পবিত্র বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ। এই বিন্যাসে শৈব ও তান্ত্রিক উপাসনার একটি বিশেষ সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। মহাকাল ভৈরবের নামের মধ্যেই রয়েছে তাঁর দর্শনের পরিচয়। ‘মহাকাল’ অর্থাৎ যিনি কালেরও অধীশ্বর। সময়ের নিয়মে সৃষ্টি হয়, সময়ের নিয়মেই একদিন সবকিছুর অবসান ঘটে। মানুষ তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ধরে রাখতে চায়, অথচ সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সেই সময়ের ঊর্ধ্বে যে চিরন্তন শক্তি, মহাকাল ভৈরব তারই প্রতীক। শিবের এই উগ্র রূপকে ঘিরে পুরাণে একটি পরিচিত কাহিনি রয়েছে। ব্রহ্মার অহংকার ও শিবের প্রতি অবমাননার পরিপ্রেক্ষিতে শিবের ভৈরবরূপের আবির্ভাব ঘটে। ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তক ছেদন করার কাহিনি ভৈরবের সঙ্গে যুক্ত। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে অহংকারের বিনাশ এবং ধর্মের প্রতিষ্ঠার ভাবনাই প্রকাশিত হয়েছে। মহাকাল ভৈরব দশভৈরবের প্রথম রূপ। তাঁর দৈনিক আরতি সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় অনুষ্ঠিত হয়। মহাশিবরাত্রিতে বিশেষ পূজা, যজ্ঞ ও শৃঙ্গারের ব্যবস্থা করা হয়।

মন্দিরে তিন দেবতা ঐক্যের আধ্যাত্মিক দর্শন
তারাশংকরী পীঠের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এখানে তিনটি ভিন্ন উপাসনা-ধারা একই প্রাঙ্গণে বিকশিত হয়েছে। মা তারাশংকরী শক্তির প্রতীক, যশোমাধব বিষ্ণুতত্ত্বের এবং মহাকাল ভৈরব শিবতত্ত্বের প্রতিনিধি। সাধারণভাবে শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব উপাসনাকে পৃথক ধর্মীয় পরম্পরা হিসেবে দেখা হলেও ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনে এদের মধ্যে বিরোধের চেয়ে সমন্বয়ের ভাবনাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন দেবতার সহাবস্থানকে বেদে বর্ণিত অদ্বৈত ও একত্ববাদের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরম সত্য এক, সেই ব্রহ্ম সর্বত্র বিরাজমান। মানুষ তার উপলব্ধির জন্য বিভিন্ন উপাসনার পথ গ্রহণ করে। দেবদেবীর রূপ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু পরম সত্ত্বার উপলব্ধিই সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য। এখানে কি একেশ্বরবাদের ধারণা প্রতিমান হয় না? বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এই সমন্বয়ের ঐতিহ্য বহু পুরনো। গ্রামবাংলার বহু মন্দিরে শিব, কালী, বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজা পাশাপাশি চলে। শাক্ত পদাবলিতে যেমন মাতৃভক্তির গভীরতা রয়েছে, তেমনই বৈষ্ণব পদাবলিতে রয়েছে প্রেম ও আত্মসমর্পণের এক কোমল সুর। আর শৈব সাধনায় রয়েছে বৈরাগ্য ও আত্মোপলব্ধির দর্শন। তারাশংকরী পীঠে এই তিনটি ধারার সহাবস্থান যেন বাংলার সেই বহুমাত্রিক ধর্মীয় সংস্কৃতিরই একটি আধুনিক প্রতিচ্ছবি। তারাশংকরী পীঠের কার্যক্রম কোনও একটি বিশেষ তিথি বা বার্ষিক উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সারা বছর ধরে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা, আরতি এবং বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়। এই মন্দিরের বার্ষিক উৎসবগুলির মধ্যে কালীপূজা, দুর্গাপূজা, মহালয়া, কৈশিকী অমাবস্যা, জন্মাষ্টমী, গুরুপূর্ণিমা, রথযাত্রা, উলটোরথ পালিত হয়। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা, দুর্গাপূজায় শক্তির আরাধনা, কালীপূজায় মহাকালীর উপাসনা এবং জন্মাষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব, সব মিলিয়ে মন্দিরের ধর্মীয় জীবন সারা বছর ধরে সক্রিয় থাকে।
সকালে মন্দির খোলা থাকে আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত এবং বিকেলে চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। মা তারার আরতি সন্ধ্যা সাতটায়, মহাকাল ভৈরবের আরতি সাড়ে ছয়টায় এবং যশোমাধবের আরতি সাড়ে সাতটায় অনুষ্ঠিত হয়। তারাশংকরী পীঠের ইতিহাসে যোগীরাজ ও যোগমাতার অবদান শুধু মন্দির প্রতিষ্ঠা বা বিগ্রহের পূজার ব্যবস্থা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মানবকল্যাণের সংযোগ স্থাপন। এই ভাবনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালের সেই সাধারণ টিনের চালাঘর থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয়েছে দেবী তারার তান্ত্রিক উপাসনা, নবমুণ্ডি আসনের সাধনপরম্পরা, কাশীর মণিকর্ণিকার অগ্নির স্মৃতি, ধামরাইয়ের যশোমাধবের শতাব্দীপ্রাচীন রথযাত্রা এবং মহাকাল ভৈরবের শৈব ঐতিহ্য। এই ইতিহাসে যেমন রয়েছে এক সাধক দম্পতির ব্যক্তিগত সাধনা, তেমনই রয়েছে একটি পরিবারের বংশপরম্পরায় বহন করে আনা ধর্মীয় উত্তরাধিকার। রয়েছে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাত পেরিয়ে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনও সংকীর্ণতা চোখে পড়ে না। শক্তি, শিব ও বিষ্ণু একই প্রাঙ্গণে আপন আপন মহিমায় বিরাজমান। কেউ মায়ের কাছে আসেন, কেউ যশোমাধবের রথের রশি ধরেন, কেউ মহাকাল ভৈরবের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন। প্রত্যেকের বিশ্বাসের ভাষা আলাদা, কিন্তু আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এক। সন্ধ্যার সময় মা তারাশংকরীর আরতি যখন শুরু হয়, প্রদীপের আলোয় গর্ভগৃহ আলোকিত হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে হয়তো কোনও ভক্তের মনে পড়ে যায় রামপ্রসাদের সেই আকুল গান, “আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা।”
