Hashtagintro

রাজ্যে জমি অধিগ্রহণে এবার ‘গুজরাট মডেল’! সমান্তরাল রেখায় শিল্প ও জমি

কর্মসংস্থান হলে গ্রাম থেকে বহু মানুষ শহরে এসে বসবাস শুরু করে। এটাই পুঁজিবাদী আর্থিক উন্নয়নের ধ্রুপদী মডেল। পশ্চিমবঙ্গে তা কাঙিক্ষত মাত্রায় ঘটতে পারেনি পরিষেবা ও উৎপাদন শিল্পের দ্রুতগতিতে অগ্রগতি না ঘটায়। শিল্পের জন্য এবার জমিনীতির হয়ে সওয়াল করলেন ‘নীতি আয়োগ’-এর ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ী। লিখছেন, সুতীর্থ চক্রবর্তী।

শিল্প না আসার কারণ জমি না পাওয়া, আর জমি না পাওয়ার কারণ জমির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা– এই চক্রে কি পশ্চিমবঙ্গ আটকে পড়েছে? নতুন সরকারের শিল্পনীতি প্রকাশের আগে রাজ্যে এ বিতর্কই ফের উসকে দিয়ে গেলেন নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ী। শিল্পের প্রয়োজনে ‘কৃষিজমি’ নিতে জোরালো সওয়াল করেছেন তিনি। রাজ্যের নতুন শিল্পনীতিতে জমির সংস্থান এবং শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রকল্পের কথা একসঙ্গে থাকা উচিত বলে তাঁর অভিমত।

শিল্পের জন্য কৃষিজমি নেওয়া যাবে না– বিগত তৃণমূল সরকারের এই নীতি থেকে যে রাজ্যের বর্তমান সরকার সরে আসবে তার ইঙ্গিত অনেক আগেই স্পষ্ট ছিল। শিল্পসংস্থার জন‌্য বাজারমূল্যে কৃষকদের থেকে সরাসরি সরকার জমি কিনবে বলে নতুন সরকারের মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত ছ’-মাসে একাধিকবার ঘোষণা করেছেন। শহরে ও গ্রামে একলপ্তে কতটা জমি মালিকানায় রাখা যাবে– সেই সংক্রান্ত জমির ঊর্ধ্বসীমা আইনগুলি সংস্কার করতেও এই সরকার তৎপরতা শুরু করেছে। ফলে রাজ্যে শিল্প কলকারখানা তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে জমি আর কোনও অন্তরায় নয়। ‘নীতি আয়োগ’-এর ভাইস চেয়ারম্যান কলকাতায় বণিকসভার অনুষ্ঠানে এ কথাগুলি ফের উচ্চারণ করে পুরনো বিতর্কটি সামনে আনার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পলগ্নি নিয়ে প্রত্যাশাও বাড়াতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, কৃষকদের শিল্পের জন‌্য জমি দেওয়ার গুরুত্বটি উপলব্ধি করতে হবে। গুজরাটের মতো রাজ্যে কৃষকরা নিজেরাই শিল্প ও পরিকাঠামোর জন‌্য সরকারকে বাজারমূল্যে জমি তুলে দিচ্ছে। প্রকল্প রূপায়ণের পরে ওই জমির একাংশ সরকার ফের কৃষকদের ফেরতও দিচ্ছে সেটি বিক্রি করে অতিরিক্ত উপার্জনের জন‌্য। একে জমি অধিগ্রহণের ‘গুজরাট মডেল’ বলা হচ্ছে।

শিল্পের জন্য কৃষিজমি নেওয়া যাবে না– বিগত তৃণমূল সরকারের এই নীতি থেকে যে রাজ্যের বর্তমান সরকার সরে আসবে তার ইঙ্গিত অনেক আগেই স্পষ্ট ছিল।

বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কার নীতি রাজ্যে কৃষিজমিকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে। জমির মালিকানার ক্ষেত্রে এই কাঠামোগত সংস্কার ও ‘অপারেশন বর্গা’ যে আটের দশক থেকে রাজ্যের কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল– তা ঐতিহাসিক সত্য। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র কমাতে ও মাথাপিছু আয় বাড়াতেও ওই নীতি জরুরি সে-সময় ছিল। সাম্প্রতিকের গবেষণাতেও দেখা গিয়েছে– মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হারে পশ্চিমবঙ্গ অন্যান্য এগিয়ে থাকা রাজ্যের তুলনায় কখনও বিশেষ পিছিয়ে থাকেনি। কিন্তু সমস্যা হয়েছে নয়ের দশকের পর কৃষির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরাঞ্চলে পরিষেবা ও উৎপাদন শিল্পের বিকাশ না হওয়ায়।

পরিষেবা ও উৎপাদন শিল্পের বিকাশ ঘটলে তা গ্রামের উদ্বৃত্ত শ্রমিককে শহরে এই নতুন ক্ষেত্রে স্থানান্তর করে। মোদ্দাকথায়, কর্মসংস্থান ও চাকরিবাকরি হলে গ্রাম থেকে বহু মানুষ শহরে এসে বসবাস শুরু করে। এটাই পুঁজিবাদী আর্থিক উন্নয়নের ধ্রুপদী মডেল। পশ্চিমবঙ্গে সেটা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটতে পারেনি পরিষেবা ও উৎপাদন শিল্পের দ্রুতগতিতে অগ্রগতি না ঘটায়। ফলে গ্রামাঞ্চলকেই এখনও বিপুল সংখ্যক জনতাকে ধরে রাখতে হয়েছে। কিছু সংখ্যক গ্রামের মানুষ ভিন রাজ্যে শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে যান। কিন্তু সেটা সার্বিকভাবে কৃষিক্ষেত্রের উপর বিশেষ চাপ কমায় না।

কৃষির উপর জনসংখ্যার এই চাপ রাজ্যে জমি-নির্ভরতার মূল কারণ। খণ্ডবিখণ্ড জমি এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। যার পরিণতি আমরা সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে দেখেছি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে শিল্পের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কৃষক ও গ্রামের মানুষের আন্দোলন তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে অনুঘটক রূপে কাজ করেছিল। তাই ক্ষমতায় এসে শিল্প ও কলকারখানা স্থাপনের জন্য জমি নেওয়া ও জমির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণের বিষয়ে কোনও আগ্রহই দেখায়নি তৃণমূলের সরকার। তাদের অলিখিত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, শিল্প লগ্নি না এলে না আসবে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলের স্থিতাবস্থাকে কোনওভাবে বিঘ্নিত করা যাবে না। আগ বাড়িয়ে জমিতে হাত না দেওয়ার এই নীতিতে গত দেড় দশকে রাজ্যের পরিকাঠামো বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। নতুন মহাসড়ক, বড় সেতু, রেল প্রকল্প ইত্যাদি তৃণমূলের সময়কালে সেভাবে কিছুই হয়নি।

গুজরাটের মতো রাজ্যে কৃষকরা নিজেরাই শিল্প ও পরিকাঠামোর জন‌্য সরকারকে বাজারমূল্যে জমি তুলে দিচ্ছে। প্রকল্প রূপায়ণের পরে ওই জমির একাংশ সরকার ফের কৃষকদের ফেরতও দিচ্ছে সেটি বিক্রি করে অতিরিক্ত উপার্জনের জন‌্য। একে জমি অধিগ্রহণের ‘গুজরাট মডেল’ বলা হচ্ছে।

রাজ্য শিল্পোন্নয়নে মরিয়া- এই বার্তা শিল্প মহলকে কখনও দেওয়ার চেষ্টাই করেনি তৃণমূল সরকার। শিল্প সংস্থা নিজের উদ্যোগে বাজার থেকে জমি কিনলে তারা প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দিয়েছে। তবে সেরকম ঘটনাও নগণ‌্য। তৃণমূল সরকার দেড় দশকে জনতার জন্য নানারকম অনুদান চালু করে এটাই বোঝাতে চেয়েছে যে, কলকারখানা সব জায়গায় হবে না। নব‌্য উদারবাদী অর্থনীতিতে দেশের কোনও কোনও প্রান্তে মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে সরকারি সাহায্যের ভরসায়।

নতুন সরকারের শিল্পনীতি ও জমিনীতির বিষয়ে তৎপরতা রাজ্যকে ফের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান গত ৫ বছর রাজ্যের বিধায়ক ছিলেন। রাজ্যের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান প্রশ্নাতীত। একাধারে অর্থনীতিবিদ ও অন্যদিকে নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে রাজ্যের প্রস্তাবিত শিল্প ও জমিনীতিতে তাঁর পরামর্শ যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তা ধরেই নেওয়া যায়। তিনি যখন বণিক মহলের সামনে জমিনীতির পরিবর্তন ও লগ্নিকারীদের আস্থা অর্জন করার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করছেন, তখন তার তাৎপর্যই ভিন্ন। নীতি আয়োগের চেয়ারম‌্যান রূপে তিনি জমি অধিগ্রহণের নীতিকে ছাড়পত্র দিতে চেয়েছেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় আইনে সরকার জমি অধিগ্রহণ করলে কৃষকরা বাজারমূল্যের থেকেও তিনগুণ বা দ্বিগুণ বেশি দাম পান।

রাজ্যের প্রস্তাবিত শিল্পনীতিতে লগ্নিতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিপুল ব্যবস্থা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে লগ্নি আকর্ষণ করার ইঁদুর দৌড়ে নামতে গেলে শিল্প সংস্থাকে কিছু আর্থিক সুযোগ সুবিধা দিতেই হবে। প্রস্তাবিত শিল্পনীতিতে সেসব থাকছে বলে জানা গিয়েছে। এর সঙ্গে প্রয়োজন জমিনীতির ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ দিনের স্থবিরতা দূর করা। বাজার থেকে সরাসরি জমি কিনে নেওয়া ছাড়াও প্রয়োজনে অধিগ্রহণের বিষয়টিও সরকারকে নীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সুস্পষ্ট জমি ও শিল্পনীতির মেলবন্ধন রাজ্যের অর্থনীতিতে ক্ষেত্রগত পরিবর্তন আনতে পারে। কলকারখানা ও পরিষেবা শিল্পে বেশি বেশি কাজ তৈরি হলে, জমির উপর রাজ্যবাসীর অতিরিক্ত জমি নির্ভরতা কমবে। এই নির্ভরতা কমলে জমি অধিগ্রহণের ‘গুজরাট মডেল’ রাজ্যে রূপায়িত করা আর কোনও কঠিন কাজ থাকবে না।

Source: Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Read full article on Sangbad Pratidin Technology & Auto (Bengali)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

समाचार की भाषा चुनें / Choose News Language