তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ করছে চিন। এরই পালটা অরুণাচল প্রদেশে ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রোজেক্ট’ (SUMP) তৈরির তৎপরতা শুরু হয়েছে কেন্দ্রের তরফে। কেন্দ্রের এই প্রকল্পের বিরোধিতায় এবার সোচ্চার হয়ে উঠলেন অরুণাচলের বাসিন্দারা। শুক্রবার রাতে ব্যাপক হিংসার পর শনিবারও ইস্ট সিয়াং জেলার পাসিঘাট, মেবো এবং রুকসিনে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৬৩ ধারা জারির পাশাপাশি এয়ারলিফট করে সিআরপিএফের ২ কোম্পানি র্যাফ পাঠানো হয়েছে সেখানে।
পুলিশের তরফে জানা যাচ্ছে, সিয়াং নদীর উপর ১১,০০০ মেগাওয়াটের এসইউএমপি প্রকল্পের বিরোধিতায় শুক্রবার ১২ ঘণ্টার বনধের ডাক দিয়েছিল স্থানীয়রা। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি হিংসাত্মক আকার নেয়। ১০ জন আন্দোলনকারীর মুক্তির দাবিতে স্থানীয়রা সোচ্চার হলে ভিড়ের উপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। এরপরই উত্তেজিত জনতা এনএইচপিসির অফিস, থানা এবং ৯টি পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুই বিধায়ক এবং বিজেপি রাজ্য সভাপতির বাড়িতেও ভাঙচুর চলে। সংঘর্ষে ৪০ জনের বেশি পুলিশ ও সিআরপিএফ জওয়ান আহত হন।
সিয়াং নদীর উপর ১১,০০০ মেগাওয়াটের এসইউএমপি প্রকল্পের বিরোধিতায় শুক্রবার ১২ ঘণ্টার বনধের ডাক দিয়েছিল স্থানীয়রা।
এরপরই পরিস্থিতি সামাল দিতে মুম্বই থেকে এয়ারলিফট করে ২ কোম্পানি র্যাফ পাঠিয়েছে কেন্দ্র। একাধিক অঞ্চলে ১৬৩ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। যার জেরে ৫ জনের বেশি জমায়েত, মিছিল, অস্ত্র বহন করা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এলাকাবাসীর কাছে শান্তি বজায় রাখার আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেখানে হিংসা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত, জনগণের সম্মতি ছাড়া প্রকল্প এগোবে না।”
উল্লেখ্য, তিব্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ করছে চিন। অরুণাচল প্রদেশ থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রকল্পে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ভারত সরকার। ইয়ারলুং সাংপো নামে যে নদীর উপর চিন এই বাঁধ তৈরি করছে সেটির উৎপত্তিস্থল তিব্বত। এরপর অরুণাচল প্রদেশে নদীটির নাম হয়েছে সিয়াং। সেখান থেকে অসমে প্রবেশ করার পর ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকা পরিচালিত হয় এই নদীকে কেন্দ্র করে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, চিন বাঁধ নির্মাণ করলে গ্রীষ্মকালে নিম্ন অববাহিকায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত জল কমে আসবে। যা ভারত ও বাংলাদেশে কৃষিকাজের পাশাপাশি ধাক্কা দেবে শিল্পকেও। পাশাপাশি পলি পরিবহণ বাধাপ্রাপ্ত হবে যা পরিবেশের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে। বেজিং অবশ্য জানিয়েছে, বাঁধের মূল উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে অন্য কোনও দেশের ক্ষতি করবে না। কিন্তু ভারত কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ। বেজিংয়ের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর কড়া নজর রাখার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে পালটা জবাবের পথ তৈরি করছে ভারত।
এই অবস্থায় সিয়াং নদীর উপর ‘এসইউএমপি’ প্রকল্প নিয়ে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে ভারতও। নয়া এই প্রকল্পে বছরে ১১০০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ তৈরি করবে ভারত। যার মূল্য ১.৫ লক্ষ কোটি। পাশাপাশি এই প্রকল্প এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ জলপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর্থিকভাবে তো বটেই ভূ-রাজনৈতিকভাবেও এই প্রকল্প অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, বড় বাঁধ হলে বহু গ্রাম ডুববে, আদিবাসীদের জমি-জীবিকা হারাবে। সরকারের যুক্তি, তিব্বতে চিন যে বাঁধ বানাচ্ছে, তার সম্ভাব্য প্রভাব ঠেকাতেই এই জাতীয় প্রকল্প জরুরি।
