চোরবাগান বড় ক্ষত দিয়ে গিয়েছে শারদোৎসবে। সেই ক্ষতের স্মৃতি মনে রেখেই আরও একবার কালীপুজোয় ভিড় সামলাতে নামছে শহর কলকাতা। যেখানে পুজো কমিটিগুলির মূল শক্তি দক্ষ ভলান্টিয়ার আর তাদের ভিড় সামলাতে তাদের সূক্ষ্ম পাঁচ-পয়জার। কলকাতার কালীপুজোর মূল ভরকেন্দ্র একদিকে ফাটাকেষ্ট নব যুবক সংঘ, অন্যদিকে সোমেন মিত্রের আমহার্স্ট স্ট্রিটের সাধারণ কালীপুজো কমিটি। মধ্য কলকাতার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পুজোয় ভিড় সামলানোর গোপন কৌশল বহু আগেই শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন সোমেন-ফাটাকেষ্টরা।
ফান্টা দা মনে করিয়ে দিয়েছেন, “সেই সময় কেষ্ট দা-রা যা শিখিয়ে দিয়েছে সেসব মেনেই আজও সব সামলানো হচ্ছে। ভিড় সামলানোর মূল মন্ত্র হচ্ছে দক্ষ ভলান্টিয়ার। পুলিশ আর কত কাজ করবে! তাছাড়া তারা তো পাড়া চেনেন না। চেনে ভলান্টিয়াররা। তাঁরাই বরাবর ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেন, এবারও তাঁদেরও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই কাজ হবে।”
কলকাতায় শুধু এই দুটি পুজোই নয়, আমহার্স্ট স্ট্রিটের শেষ মাথায় বউবাজারের কাছে রয়েছে মন্ত্রী তাপস রায়ের যুবশ্রী-সহ আরও দু’-একটি পুজো। দক্ষিণ কলকাতাতেও বেশ কিছু নামকরা পুজো হয় বটে। কিন্তু জনতার রাশ বা ঢল যা থাকে তা মূলত কলেজ-স্ট্রিট, আমহার্স্ট স্ট্রিটকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট অংশে। তার সঙ্গে অবশ্য ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি, ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতেও ভক্তদের কিছু জমায়েত থাকে। তবে পুজোয় ফাটাকেষ্টর ঠাকুর দেখে সেখানকার মেলা ঘুরে পাশের পাড়ার সোমেন মিত্রের কালীপুজো দেখাটা একপ্রকার দস্তুর। সাধারণভাবে শিয়ালদহ হয়ে কলেজ স্ট্রিট পৌঁছে দর্শনার্থীদের ভিড় একদিকে ফাটাকেষ্টর পাড়ার কেশন সেন স্ট্রিট, অন্যদিকে তাদের পুজো মণ্ডপের গলি সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট হয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিটে গিয়ে পড়ে। এই পথই এই এলাকার ভিড়ের মূল সার্কিট বা গতিপথ বলে জানাচ্ছেন পুজো কমিটির কর্তারা। তাঁদের বক্তব্য, ঠিক এখানেই লুকিয়ে রয়েছে সেই ভিড় সামলানোর কৌশল। ফাটাকেষ্টর বড় চ্যালেঞ্জ আবার পরপর দুটি সরু গলি। এতদিন এই গলি দিয়ে দর্শনার্থীদের ঠাকুর দেখে ফিরে আসায় কিছুটা ছাড় ছিল। কিন্তু এবার সেসব একেবারে বন্ধ।

এই পাড়ায় মোটামুটি সব পুজোরই উদ্বোধন ৬ নভেম্বর। তার আগেই নিরাপত্তাব্যবস্থার সব দিক বারবার খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখানেই ফাটাকেষ্টর পুজোর অর্গানাইজিং সেক্রেটারি প্রবন্ধ রায় ওরফে ফান্টা দা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এখন কালীপুজোর সময় যা ভিড় তাঁদের পাড়ায় হয়, তার থেকে আরও কয়েকগুণ ভিড় বাংলার স্বর্ণযুগে বা তার পরে নয়ের দশক, এমনকী, নতুন শতাব্দীর শুরুতেও হয়েছে। তাঁর কথায়, “তখন উত্তমকুমার, অমিতাভ বচ্চনরা আসতেন। হিন্দি ছবির হেমা মালিনী, শ্রীদেবী এদের দেখতে কেশব সেন স্ট্রিট উপচে পড়ত। সেসব ভিড়ের দিন অতীত।” ফান্টা দা মনে করিয়ে দিয়েছেন, “সেই সময় কেষ্ট দা-রা যা শিখিয়ে দিয়েছে সেসব মেনেই আজও সব সামলানো হচ্ছে। ভিড় সামলানোর মূল মন্ত্র হচ্ছে দক্ষ ভলান্টিয়ার। পুলিশ আর কত কাজ করবে! তাছাড়া তারা তো পাড়া চেনেন না। চেনে ভলান্টিয়াররা। তাঁরাই বরাবর ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেন, এবারও তাঁদেরও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই কাজ হবে।” তবে এবার কী ফাটাকেষ্ট, কী সোমেন মিত্রের আমহার্স্ট স্ট্রিটের পুজো, দুই ক্ষেত্রেই ভলান্টিয়ার প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। ভলান্টিয়াররা জানেন কত লোককে কোথায় আটকাতে হবে, কতজনকে একসঙ্গে ছাড়তে হবে। সঙ্গে থাকছে বাড়তি সিসিটিভি, মাতৃ প্রতিমার জন্য আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থা, সিভিক ভলান্টিয়ার। সব শেষের স্তরে পুলিশ। দফায় দফায় ইতিমধ্যেই বড় টিম সরেজমিনও করে গিয়েছে।
পুজো কমিটির অন্যতম সদস্য অচিন্ত্য লাহা একটি বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছেন। দুর্গাপুজোয় শহরজুড়ে অসংখ্য মানুষের ভিড় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যায়। সেই ভিড় সামলানো বড় দক্ষতার কাজ। তবে কালীপুজোর ভিড় শুধু কলকাতামুখী নয়। মূলত উত্তর ২৪ পরগনার একটা বড় অংশ বারাসত-মধ্যমগ্রাম আবার নৈহাটি-শ্যামনগর-হালিশহরের কালীপুজোয় যান। ফলে ওখানেই ভিড় ভাগ হয়ে যায়। ফলে ভিড়টা সেখানেই ‘ডাইভারসিফায়েড’ হয়ে যায়। রাজ্যের আরও দুটি অংশ যেমন একদিকে আসনসোল লাগোয়া শহরের অনেকাংশ এবং উত্তরের শিলিগুড়ি লাগোয়া বড় একটা অংশেও ঠিক এভাবেই ভিড় সামলানো হয়।
ফাটাকেষ্টর পাড়া ঘুরে সোমেন মিত্রের পাড়ায় না গেলে যেন কলকাতার কালীপুজো দেখাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ওই পাড়ার বড় ‘অ্যাডভান্টেজ’ বড় রাস্তার উপরেই পুজো। পুজো কমিটির দুই উদ্যোক্তারা রাখাল বেরা আর সুমন রায়চৌধুরিরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন প্রশাসনের সঙ্গে। তাঁদের পুজোতেও নিরাপত্তায় কোনও আপস করা হচ্ছে না। রাখাল বেরার কথায়, “আমাদের মাতৃ প্রতিমা দেখতে বহু মানুষ আসেন। তাঁদের নিরাপত্তাও দেখতে হবে, মা-র জন্যও আলাদা নিরাপত্তা রাখা হচ্ছে।” সুমনের কথায়, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসার জন্য জরুরি ব্যবস্থাও থাকছে। আর সব থেকে বড় কথা প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের সব সময় যোগাযোগ থাকছে।” যুবশ্রীর কর্তা মন্ত্রী তাপস রায় মনে করিয়ে দিয়েছেন, “চোরবাগানের মতো দুঃখজনক ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবেই। মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ যেমন একটা বিষয়, তেমনই আরেকটা বিষয় বাজির উপদ্রব। সব দিকেই নজর রাখতে হবে আমাদের।”
