যে কোনও ‘ক্রাইম’ সিরিজে মহিলারা প্রধানত পার্শ্বচরিত্র হতেই অভ্যস্ত। সেখানে ধরমরাজ শেট্টি পরিচালিত ‘আক্কা’ সিরিজটি চিরাচরিত ছক থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষিণ ভারতের কাল্পনিক রাজ্য পেরনুরুর আখ্যান দেখায় যা আটশো বছর ধরে নারীদের দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে। অর্থাৎ সমাজ এখানে মাতৃতান্ত্রিক। বহুকাল আগে রাজা যখন যুদ্ধে গিয়ে আর ফেরে না – তখন রানিরাই নিজেদের হাতে তুলে নেয় রাজ্যশাসনের ভার। সেই থেকে পেরনুরুতে মাতৃতন্ত্রের প্রচলন। আর তাদের হাত ধরেই এ রাজ্য উচ্চস্বাক্ষরতাসম্পন্ন ও সমৃদ্ধ।
১৯৪০ সালে দেশের সরকারের সঙ্গে আপোস করলেও সে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম। বর্তমানে পেরনুরুর রাজ্যের তিন মূল অঞ্চল – মালেমার, পেরপ্লাড়ি ও হেরকাড়া শাসন করে রানিদের যোগ্য উত্তরসূরিরা। দেশি মদ ও সোনার ব্যবসায় গোটা দেশে তাদের সুনাম-দুর্নাম। সারা দেশ যেখানে পুরুষশাসিত সমাজে বাস করছে, সেখানে কেবল মেয়েরাই একটা রাজ্যের সমস্ত প্রতিপত্তি ধরে রেখেছে – এর জন্য কম লড়াই করতে হয় না তাদের প্রতিনিয়ত।

মালেমার অঞ্চলের ‘আক্কা’ ভবানী (কীর্তি সুরেশ) মনে-প্রাণে তার পূর্বসূরিদের ট্র্যাডিশন ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর – কারণ পেরনুরুর সমাজ মেয়েদের বিয়ের অনুমতি দেয় না। আবার নিজের কোনও সন্তান (বা দত্তক) না থাকলে কেউ ‘আক্কা’ হওয়ার অনুমতিও পায় না। তবে পেরনুরুর শান্তি বিঘ্নিত হয়, যখন সেই রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে হানা দেয় রুদ্রা (রাধিকা আপ্তে), যার শিকড় আবার এই রাজ্যেরই এক জটিল অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে।
আপাত দৃষ্টিতে ‘আক্কা’ এমন একটি সিরিজ যেখানে মূল পরিচালনার কান্ডারি মহিলারাই। তারাই সর্বেসর্বা। তারাই রাজ্য শাসন করে, আবার তারাই স্বজনপোষনের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু এত কিছুর পরেও এই সিরিজের নির্মাতারা চিরাচরিত ‘মেল গেজ’-এর উপরে উঠতে পারে না। সেটা স্পষ্ট হয় রুদ্রা ও ভবানীর সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অভিনেতাদের জামা-কাপড় পরার ধরনে। সেই সঙ্গে হুসেইন ও আব্বাস দালালের লেখা কিছু সংলাপ যেমন – ‘অউরতোঁ কি সমাজ মে মর্দ বনকে আচ্ছা লাগতা হ্যায়?’ ধাক্কা দেয়।

তবুও ‘আক্কা’ কোথাও গিয়ে এক স্বতন্ত্র গল্প বলার চেষ্টা করে। এই গল্প তৈরির পিছনে যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা আছে, পেরনুরুর ইতিহাস রচনার নেপথ্যে একধরনের সচেতনতা আছে। সিরিজের মূল উদ্দেশ্য দর্শককে অবগত করা যে পিতৃতন্ত্রই হোক বা মাতৃতন্ত্র – কোনও কিছুই ক্ষমতায় বেশিদিন থাকলে তাদের মধ্যে তফাত করা যায় না। কেবল শাসকের লিঙ্গ পরিবর্তন করলেই সামাজিক শৃঙ্খলার কার্যপদ্ধতিতে বিশেষ কোনও পরিবর্তন আসে না যতক্ষণ না কেউ প্রতিবাদ করছে।

এই সিরিজের মূল কান্ডারি কীর্তি সুরেশ ও রাধিকা আপ্তে। এই সিরিজের লেখকও ধরমরাজ শেট্টি নিজেই। রাধিকার চরিত্রটি যথাযথ হলেও কীর্তি অভিনীত ভবানী চরিত্রে মনযোগ কম পড়েছে। তা সত্ত্বেও কীর্তি সুরেশ তাঁর অভিনয় দিয়ে এই খামতি অনেকটাই ঢেকে দিতে সক্ষম হয়েছেন। রাধিকা আপ্তে অভিজ্ঞ অভিনেত্রী, তবে কিছু দৃশ্যে তাঁকে আড়ষ্ট লেগেছে।
ছোট চরিত্রে নজর কাড়েন মহেশ মঞ্জরেকর, তনভি আজমি, ও অংশুমান পুষ্কর। আটের দশকের পেরনুরু বা বম্বের দৃশ্যায়নের প্রতি মনযোগ এই সিরিজের দৃশ্যগুলিকে আরও যথার্থ করে তোলে।
পাঁচ এপিসোডের এই সিরিজ শেষ হয় দ্বিতীয় সিজনের আভাস দিয়ে। তথাকথিত মাতৃতন্ত্রের স্বৈরাচার কি সেখানেও বজায় থাকবে? এই প্রশ্নই ‘আক্কা’ রেখে যায় দর্শকের মনে।
