গোড়া থেকেই রণবীর কাপুরের ‘রাম’ অবতার ঘিরে চরম বিতর্ক! রঘুনন্দনের বেশে কাপুরনন্দনকে দেখে এযাবৎকাল ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের অনেকেরই ভ্রুযুগল আন্দোলিত হয়েছে! কেউ ‘গোমাংস ভক্ষণকারী’ অভিনেতাকে রামের ভূমিকায় দেখে আপত্তি তুলেছিলেন, তো কারও কাছে বা আবার বেমানান ঠেকেছে রণবীরের লুক। বিশেষ করে ‘অ্যানিম্যাল’-এর মতো উগ্র পৌরুষত্বের ছবি করার পর একেবারে বিপরীতধর্মী চরিত্র রঘুনন্দনের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় করা নিয়ে আপত্তি উঠেছিল ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল থেকেও। প্রশ্ন উঠেছিল, ‘অ্যানিম্যাল’-এ নৃশংস চরিত্রে দেখার পর কাপুরনন্দনকে কীভাবে রামের ভূমিকায় মেনে নেবেন দর্শক? দীর্ঘ বিতর্কযজ্ঞ নিয়ে এবার মার্কিন মুলুকে ‘রামায়ণ’ প্রচারে মুখ খুললেন রণবীর কাপুর।
“এটা সেই পুরনো গানটার কথা মনে করিয়ে দেয়- ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা’…”
আসলে ‘রামায়ণ’-এর জন্য ধনুকভাঙা পণ করেছিলেন রণবীর কাপুর। রঘুনন্দনের চরিত্র আত্মস্থ করতে নিভৃতেই বছর তিনেক ধরে তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। চাবুক ফিগার গড়তে হাড়ভাঙা খাটুনিও করতে হয়েছে অভিনেতাকে। ‘রামের সুমতি’তে ত্যাগ করেন মদ্যপান থেকে মাংস ভক্ষণও। রামদর্শনে বিভোর রণবীরের এহেন ‘পরিবর্তন’ নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। এবার নম্র শব্দচয়নে সব কটাক্ষ, সমালোচনার জবাব দিলেন অভিনেতা। রণবীরের মন্তব্য, “বর্তমানে অনলাইন ট্রোলিংয়ের বিষয়টি বেশ প্রাসঙ্গিক। এটা সেই পুরনো গানটার কথা মনে করিয়ে দেয়- ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা’ (মানুষ কিছু না কিছু বলবেই, বলাটাই তো তাদের কাজ)। আমার মনে হয়, এই গানের কথাটা আজীবন মেনে চলার মতো দর্শন। মানুষ কী বলছে, তা নিয়ে বিচলিত হওয়ার দরকার নেই। আসল বিষয়টা হল— যাঁরা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, যাঁরা আপনার কাজ, আপনার উদ্দেশ্য এবং আপনার বিনম্রতাকে গুরুত্ব দেন, তাঁদের মতামতই সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” রণবীরের কথায় সায় দিয়ে পরিচালক নীতেশ তিওয়ারিও বলেন, “আপনার বিবেক পরিষ্কার থাকলে এবং আপনি যদি শতভাগ চেষ্টা করেন, তাহলে ট্রোলকে পাত্তা দেওয়ার কী প্রয়োজন?”

আর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার অপেক্ষা। ৫ নভেম্বর বড়পর্দায় মুক্তি পাচ্ছে চার হাজার কোটির মহাকাব্য ‘রামায়ণ’। যার বাজেট প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে এহেন বাজেটে ছবি তৈরি হয়নি। সুতরাং, সে দিক থেকে দেখতে গেলে রণবীর কাপুরের ‘রামায়ণ’ই হতে চলেছে ভারতীয় সিনেমার মহার্ঘতম ছবি। অতঃপর বিশ্ব সিনেবাজারে দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দাপট থাকলেও এইপ্রথম এহেন গগনচুম্বী বাজেটের ছবির জন্য কলার তোলার সাহস পেল বলিউড। তবে এহেন মেগাবাজেট বলিউড সিনেমার মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেও নিজেকে ‘বলিউড হিরো’ বলতে নারাজ রণবীর কাপুর। কেন? নিজেই তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিনেতা।
“আমরা এমন একটি দেশ থেকে এসেছি যেখানে নানা সংস্কৃতি, নানা ভাষার মানুষের বাস। কিন্তু দিনশেষে, আমরা সবাই তো সিনেশিল্পে নিয়োজিত।…”
রণবীরের মন্তব্য, “বলিউড মূলত হলিউড থেকে অনুপ্রাণিত একটি শব্দ। যেহেতু তখন মুম্বইয়ের নাম ছিল বম্বে, তাই এটি হয়ে গেল ‘বলিউড’। একইভাবে তেলুগু চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে গেল ‘টলিউড’— এভাবে বিভিন্ন নামে এদের ডাকা শুরু হল।” আসলে বলিউড এবং দক্ষিণী সিনেইন্ডাস্ট্রির বিভাজনও না-পসন্দ অভিনেতার। রণবীর বললেন, “আমি ভারতীয় সিনেমার একজন প্রতিনিধি। আমরা এমন একটি দেশ থেকে এসেছি যেখানে নানা সংস্কৃতি, নানা ভাষার মানুষের বাস। কিন্তু দিনশেষে, আমরা সবাই তো সিনেশিল্পে নিয়োজিত। আর শিল্প মানুষকে একত্রিত করে। শিল্পের তো কোনও সীমানা নেই। আপনি যদি আপনার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের শিকড়ের কোনও ভালো ও খাঁটি গল্প বলেন, তবে তা বিশ্বজুড়েই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়। আমরা ‘ক্রাউচিং টাইগার, হিডেন ড্রাগন’-এর মতো সিনেমায়, কোরিয়ান চলচ্চিত্রে কিংবা ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’-এর মতো সিনেমায় এমনটাই ঘটতে দেখেছি। আমাদের লক্ষ্যটাও ঠিক এটাই— তবে এর মানে এই নয় যে, আপনি কেবল অন্ধভাবে বিশ্বব্যাপী দর্শককে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন। বরং নিজের সংস্কৃতি নিয়ে খাঁটি থাকার চেষ্টা করছেন।”
